ছন্দ ও অলঙ্কার।

                  ছন্দ ও অলঙ্কার —

ছন্দ ঃ বাক্য- পরম্পরায় ভাষাগত ধ্বনি-প্রবাহের সুসমঞ্জস, সঙ্গীত-মধুর ও তরঙ্গ-ঝুঙ্কৃত ভঙ্গি রচনা করা হয় যে পরিমিত পদবিনাস রীতিতে, তাকে ছন্দ বলে। পর্বই ছন্দের প্রধান উপাদান। যে জন্য বলা যায়, ধ্বনির সঙ্গে তার উচ্চারণগত সময়ের সামাঞ্জস্য বিধানের নাম ছন্দ । ছন্দ চক্ষুগ্রাহ্য নয়, এটি শ্রুতিগ্রাহ্য। এ জন্য ছন্দ ধরা পড়ে তখনই, যখন কবিতা আবৃত্তি করা হয়।
অক্ষর ঃ বাগযন্ত্রে স্বল্পতম প্রচেষ্টায় যে ধ্বনি বা ধ্বণিগুচ্ছ উচ্চরিত হয় তাকে অক্ষর বলে। উচ্চারণসাধ্য হ্রস্বতম ধ্বনি অক্ষর হিসাবে পরিচিত; অর্থাৎ স্বরধ্বনি অথবা সরধ্বনির সাহ্যয্যে উচ্চারিত ক্ষদ্রতম শব্দ বা শব্দাংশকেই অক্ষর (ঝুষষধনষব) বলে।
যেমন-‘কম্পন’
যেমন-‘কম্পন’ শাব্দটিতে দুটি অক্ষর-‘কম্’ ও ‘পন্’।
মাত্রা ঃ অক্ষর উচ্চারণের কাল পরিমাণকে মাত্রা (গড়ৎধ) বলে। একটি অক্ষর উচ্চারণের জন্য যে সময় বা উঁৎধঃরড়হ প্রয়োজন, সে সময় অনুসারেই প্রতিটি অক্ষরের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। যেমন-
ম নে প ড়ে ক ত ক থা
বাংলা ছন্দকে ছন্দতত্ত্ববিদরা প্রধানত তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। তবে এই তিন প্রকার ছন্দের নামকরণ বিষয়ে তাঁদের মধ্যে মতৈক্য নেই। বাংলা ছন্ধের এ তিন প্রধান শ্রেণী হচ্ছে :-
(ক) মাত্রবৃত্ত ছন্দ ঃ একে ধ্বনি-প্রধান, ধ্বনিমাত্রিক, বিস্তার-প্রধান বা দুর্বল ভঙ্গির ছন্দও (গড়ৎরপ গবঃৎব) বলা হয়।
বৈশিষ্ট্য —
 অক্ষরের শেষে স্বরধ্বনি থাকলে ১ মাত্রা গুনতে হয় ; আর অক্ষরের শেষে ব্যঞ্জনধ্বনি থাকলে (য় থাকলেও) ২ মাত্রা গুনতে হয়; য় থাকলে, যেমন- হয়, কয়; য়-কে বলা যায় ংবসর-াড়বিষ,, পুরো স্বরধ্বনি নয়, তাই এটি অক্ষরের শেষে থাকলে মাত্রা ২ হয়।
 কবিতা আবৃত্তির গতি স্বরবৃত্ত ছন্দের চেয়ে ধীর, কিন্তু অক্ষরবৃত্তের চেয়ে দ্রুত।
এইখানে তোর / দাদির কবর / ডালিম-গাছের ∣ তলে ৬+৬+৬+২
তিরিশ বছর / ভিজায়ে রেখেছি / দুই নয়েনের ∣ জলে ৬+৬+৬+২
(কবর; জসীমউদদীন)
কবিতাটির মূল পর্ব ৬ মাত্রার। প্রতি চরণে তিনটি ৬ মাত্রার পূর্ণ পর্ব এবং একটি ২ মাত্রার অপূর্ণ পর্ব আছে।
এখন মাত্রা গণনা করলে দেখা যাচ্ছে, প্রথম চরণের-
প্রথম পর্ব- এইখানে তোর; এ+ই+খা+নে = ৪ মাত্রা (প্রতিটি অক্ষরের শেষে স্বরধ্বনি থাকায় প্রতিটি ১ মাত্রা); তোর = ২ মাত্রা (অক্ষরের শেষে ব্যঞ্জনধ্বনি থাকায় ২ মাত্রা)।
দ্বিতীয় পর্ব- দাদির কবর; দা+দির = ১+২ = ৩ মাত্রা; ক+বর = ১+২ = ৩ মাত্রা।
তৃতীয় পর্ব- ডালিম-গাছের; ডা+লিম = ১+২ = ৩ মাত্রা; গা+ছের = ১+২ = ৩ মাত্রা।
চতুর্থ পর্ব- তলে; ত+লে = ১+১ = ২ মাত্রা।
(খ) স্বরবৃত্ত ছন্দ ঃ একে বলবৃত্ত বলপ্রধান, স্বরাঘাত প্রধান,শ্বাসাঘাত প্রধান, প্রস্বর প্রধান, ছড়ার ছন্দ বা লেীকিক ছন্দ কিংবা প্রবল ভঙ্গির ছন্দও (ঝঃৎবংংবফ গবঃৎব) বলা হয়।
স্বরবৃত্ত ছন্দে লেখা কবিতাগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চার মাত্রার চালে চলতে পছন্দ করে। প্রধানত ছড়া এবং গান লিখতেই এই ছন্দ সচরাচর ব্যবহৃত হয়।
# স্বরবৃত্তের মূল বিষয়টিই আবর্তিত হয় দুটি সিলেবল বা দলকে (মুক্ত ও বদ্ধ দল) ঘিরে।
# স্বরবৃত্ত দ্রুত লয়ের ছন্দ।
# এই ছন্দের মূলপর্ব বা পূর্ণপর্ব চার মাত্রাবিশিষ্ট।
#মুক্তদল বা মুক্তাক্ষর এবং রুদ্ধদল বা বদ্ধাক্ষর উভয়ই একমাত্রাবিশিষ্ট।
পর্বগুলো ছোট এবং দ্রুতলয়বিশিষ্ট।
#এই ছন্দে যতি এবং দল ঘন ঘন পড়েবলে বাগযন্ত্র দ্রুততা লাভ করে।
প্রতি পর্বের প্রথম অক্ষর শ্বাসাঘাতযুক্ত।
#এই ছন্দের প্রয়োাজনে ৫ মাত্রাকে সংবৃত উচ্চারণে ৪ মাত্রার মত আবৃত্তি করা যায়, আবার কোথাও এক মাত্রা কম থাকলে বিবৃত উচ্চারণ করে এক মাত্রাকে দুই মাত্রায় টেনে নেয়া যায়।
যেমন– ‘রাখাল ছেলে!/ রাখাল ছেলে! /বারেক ফিরে/ চাও,
বাঁকা গায়ের/ পথটি বেয়ে /কোথায় চলে/ যাও?’
‘ওই যে দেখ/ নীল-নোয়ান /সবুজ ঘেরা/ গাঁ,
কলার পাতা /দোলায় চামর /শিশির ধোয়ায়/ পা;
(গ) অক্ষরবৃত্ত ছন্দ ঃ একে তান প্রধান, অক্ষরমাত্রিক, মিশ্র প্রকৃতির, সঙ্কোচ প্রধান বা সাধারণ ভঙ্গির ছন্দও বলা হয়।
বৈশিষ্ট্য — অক্ষরবৃত্ত ছন্দে মূল পর্ব ৮ বা ১০ মাত্রার হয়।
#অক্ষরবৃত্ত ছন্দে মুক্তাক্ষর ১ মাত্রা, যুক্তাক্ষর শব্দের প্রথমে ও মাঝে ১ মাত্রা কিন্তু শব্দের শেষে যুক্তাক্ষর ২ মাত্রা।
#অক্ষরের শেষে স্বরধ্বনি থাকলে ১ মাত্রা গুনতে হয়।
#অক্ষরের শেষে ব্যঞ্জনধ্বনি আছে, এমন অক্ষর শব্দের শেষে থাকলে ২ মাত্রা হয়; শব্দের শুরুতে বা মাঝে থাকলে ১ মাত্রা হয়।
#কোন শব্দ এক অক্ষরের হলে, এবং সেই অক্ষরের শেষে ব্যঞ্জনধ্বনি থাকলে, সেই অক্ষরটির মাত্রা ২ হয়।
# কোন সমাসবদ্ধ পদের শুরুতে যদি এমন অক্ষর থাকে, যার শেষে ব্যঞ্জনধ্বনি আছে, তবে সেই অক্ষরের মাত্রা ১ বা ২ হতে পারে।
# অক্ষরবৃত্ত ছন্দে লিখা কবিতার আবৃত্তি ধীরগতি হয়।
যেমন—
হে কবি, নীরব কেন/ফাগুন যে এসেছে ধরায় ৮+১০
বসন্তে বরিয়া তুমি/লবে না কি তব বন্দনায় ৮+১০
কহিল সে স্নিগ্ধ আঁখি তুলি- ১০
দক্ষিণ দুয়ার গেছে খুলি? 

Similar Posts