সংক্ষেপে বহুব্রীহিসমাস চিনে রাখি।

সংক্ষেপে বহুব্রীহিসমাস চিনে রাখি।

যে সমাসে সমস্যমান পদগুলোর কোনোটির অর্থ না বুঝিয়ে, অন্য কোনো পদকে বোঝায়, তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে।[১] যেমন: বহু ব্রীহি (ধান) আছে যার= বহুব্রীহি। এখানের ‘বহু’ কিংবা ‘ধান’ কোনোটিরই অর্থের প্রাধান্য নেই, যার বহু ধান আছে এমন লোককে বোঝাচ্ছে।

বহুব্রীহি সমাসে সাধারণত যার, যাতে ইত্যাদি শব্দ ব্যাসবাক্যরূপে ব্যবহৃত হয়।

প্রকারভেদ সম্পাদনা
বহুব্রীহি সমাস আট প্রকার।যথা:

১. সমানাধিকরণ বহুব্রীহি
পূর্বপদ বিশেষণ আর পরপদ বিশেষ্য হলে সমানাধিকরণ বহুব্রীহি হয়। যেমন: হত হয়েছে শ্রী যার= হতশ্রী, খোশ মেজাজ যার= খোশমেজাজ। এরূপ- হৃতসর্বস্ব, উচ্চশির, পীতাম্বর, নীলকণ্ঠ, জবরদস্তি, সুশীল, সুশ্রী, বদবখ্ত, কমবখ্ত ইত্যাদি।

২. ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি

বহুব্রীহি সমাসের পূর্বপদ এবং পরপদ কোনোটিই যদি বিশেষণ না হয়, তবে তাকে ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি বলে। যেমন: আশীতে (দাঁতে) বিষ যার= আশীবিষ, কথা সর্বস্ব যার= কথাসর্বস্ব।

পরপদ কৃদন্ত বিশেষণ হলেও ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি সমাস হয়। যেমন: দুই কান কাটা যার= দু কানকাটা, বোঁটা খসেছে যার= বোঁটাখসা। অনুরূপভাবে- ছা-পোষা, পা-চাটা, পাতা-চাটা, পাতাছেঁড়া, ধামাধরা ইত্যাদি।

৩. ব্যতিহার বহুব্রীহি

ক্রিয়ার পারস্পরিক অর্থে ব্যতিহার বহুব্রীহি হয়। এ সমাসে পূর্বপদে ‘আ’ এবং পরপদে ‘ই’ যুক্ত হয়। যেমন: হাতে হাতে যে যুদ্ধ= হাতাহাতি, কানে কানে যে কথা= কানাকানি। এরূপ- চুলাচুলি, কাড়াকাড়ি, গালাগালি, দেখাদেখি, কোলাকুলি, লাঠালাঠি, হাসাহাসি, গুঁতাগুঁতি, ঘুষাঘুষি ইত্যাদি।

৪. নঞ্ বহুব্রীহি

বিশেষ্য পূর্বপদের আগে নঞ্ (না অর্থবোধক) অব্যয় যোগ করে বহুব্রীহি সমাস কিরা হলে তাকে নঞ্ বহুব্রীহি বলে। নঞ্ বহুব্রীহি সমাসে সাধিত পদটি বিশেষণ হয়। যেমন: ন (নাই) জ্ঞান যার= অজ্ঞান, বে (নাই) হেড যার= বেহেড, না (নাই) চারা (উপায়) যার= নাচার, নি (নাই) ভুল যার= নির্ভুল, না (নয়) জানা যা= নাজানা, অজানা ইত্যাদি। এরূপ- নাহক, নিরুপায়, নির্ঝঞ্ঝাট, অবুঝ, অকেজো, বে-পরোয়া, বেঁহুশ, অনন্ত, বেতার ইত্যাদি।

৫. মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি

বহুব্রীহি সমাসের ব্যাখ্যার জন্য ব্যবহৃত বাক্যাংশের কোনো অংশ যদি সমস্তপদে লোপ পায়, তবে তাকে মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি বলে। যেমন: বিড়ালের চোখের ন্যায় চোখ যে নারীর= বিড়ালচোখী, হাতে খড়ি দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে= হাতেখড়ি। এরূপ- গায়ে হলুদ, মেনিমুখো,সোনাক্ষি= সোনার ন্যায়মূল্যপূর্ন অক্ষি যার, জন্মাষ্টমী= জন্ম হয়েছে অষ্টমীর দিনে যার, রুদ্রাক্ষী= রুদ্র রূপ হইতে অক্ষি যার, শ্রাবণমাস= শ্রাবণমাস হইতে বর্ষা হওয়ার কাল যা 》এরূপ ইত্যাদি।

৬. প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি

যে বহুব্রীহি সমাসের সমস্তপদে আ, এ, ও ইত্যাদি প্রত্যয় যুক্ত হয় তাকে প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি বলা হয়। যেমন: এক দিকে চোখ (দৃষ্টি) যার= একচোখা (চোখ+আ), ঘরের দিকে মুখ যার= ঘরমুখো (মুখ+ও), নিঃ (নেই) খরচ যার= নি-খরচে (খরচ+এ), তিন (তে) ভাগ যার= তেভাগা (আন্দোলনবিশেষ; ভাগ+আ)। এরূপ- দোটানা, দোমনা, একগুঁয়ে, অকেজো, একঘরে, দোনলা, দোতলা, ঊনপাঁজুরে ইত্যাদি।

৭. অলুক বহুব্রীহি

যে বহুব্রীহি সমাসে পূর্ব বা পরপদের কোনো পরিবর্তন হয় না, তাকে অলুক বহুব্রীহি বলে। অলুক বহুব্রীহি সমাসে সমস্ত পদটি বিশেষণ হয়। যেমন: মাথায় পাগড়ি যার= মাথায়পাগড়ি, গলায় গামছা যার= গলায়গামছা (লোকটি)। এরূপ- হাতে-ছড়ি, কানে-কলম, গায়ে-পড়া, হাতে-বেড়ি, মাথায়-ছাতা, মুখে-ভাত, কানে-খাটো ইত্যাদি।

৮. সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি

পূর্বপদ সংখ্যাবাচক এবং পরপদ বিশেষ্য হলে এবং সমস্তপদটি বিশেষণ বোঝালে তাকে সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি বলা হয়। এ সমাসে সমস্তপদে ‘আ’, ‘ই’ না ‘ঈ’ যুক্ত হয়। যেমন: দশ গজ পরিমাণ যার= দশগজি, চৌ (চার) চাল যে ঘরের= চৌচালা। এরূপ- চারহাতি, তেপায়া ইত্যাদি।

কিন্তু, সে (তিন) তার (যে যন্ত্রের)= সেতার (বিশেষ্য)।

বহুব্রীহি সমাসের নিয়ম

বহুব্রীহি সমাসে সাধারণত যার, যাতে ইত্যাদি শব্দ ব্যাস বাক্যরূপে ব্যবহৃত হয়। যেমন: আয়ত লোচন যার= আয়তলোচনা (স্ত্রী), মহান আত্মা যার= মহাত্মা, স্বচ্ছ সলিল যার= স্বচ্ছসলিলা, নীল বসন যার= নীলবসনা, স্থির প্রতিজ্ঞা যার= স্থিরপ্রতিজ্ঞ, ধীরবুদ্ধি যার= ধীরবুদ্ধি।

‘সহ’ কিংবা ‘সহিত’ শব্দের সঙ্গে অন্য পদের বহুব্রীহি সমাস হলে ‘সহ’ ও ‘সহিত’ এর স্থলে ‘স’ হয়। যেমন: বান্ধবসহ বর্তমান= সবান্ধব, সহ উদর যার= সহোদর> সোদর। এরূপ- সজল, সফল, সদর্প, সলজ্জ, সকল্যাণ ইত্যাদি।

বহুব্রীহি সমাসে পরপদে মাতৃ, পত্নী, পুত্র, স্ত্রী ইত্যাদি শব্দ থাকলে এ শব্দগুলোর সাথে ‘ক’ যুক্ত হয়। যেমন: নদী মাতা (মাতৃ) যার= নদীমাতৃক, বি (বিগত) হয়েছে পত্নী যার= বিপত্নীক। এরূপ- সস্ত্রীক, অপুত্রক ইত্যাদি।

বহুব্রীহি সমাসে সমস্ত পদে ‘অক্ষি’ শব্দের স্থলে ‘অক্ষ’ এবং ‘নাভি’ শব্দের স্থলে ‘নাভ’ হয়। যেমন: কমলের ন্যায় অক্ষি যার= কমলাক্ষ, পদ্ম নাভিতে যার= পদ্মনাভ। এরূপ- ঊর্ণনাভ।

বহুব্রীহি সমাসে পরপদে ‘জায়া’ শব্দ স্থানে ‘জানি’ হয় এবং পূর্বপদের কিছু পরিবর্তন হয়। যেমন: যুবতী জায়া যার= যুবজানি (‘যুবতী’ স্থলে ‘যুব’ এবং ‘জায়া’ স্থলে ‘জানি’ হয়েছে)।

বহুব্রীহি সমাসে পরপদে ‘চূড়া’ শব্দ সমস্ত পদে ‘চূড়’ এবং ‘কর্ম’ শব্দ সমস্ত পদে ‘কর্মা’ হয়। যেমন: চন্দ্র চূড়া যার= চন্দ্রচূড়, বিচিত্র কর্ম যার= বিচিত্রকর্মা।

বহুব্রীহি সমাসে ‘সমান’ শব্দের স্থানে ‘স’ এবং ‘সহ’ হয়। যেমন: সমান কর্মী যে= সহকর্মী, সমান বর্ণ যার= সমবর্ণ, সমান উদর যার= সহোদর।

বহুব্রীহি সমাসে পরপদে ‘গন্ধ’ শব্দ স্থানে ‘গন্ধি’ বা ‘গন্ধা’ হয়। যেমন: সুগন্ধ যার= সুগন্ধি, পদ্মের ন্যায় গন্ধ যার= পদ্মগন্ধি, মৎস্যের ন্যায় গন্ধ যার= মৎস্যগন্ধা।

নিপাতনে সিদ্ধ বহুব্রীহি

এই ধরনের বহুব্রীহি সমাস কোনো নিয়মের অধীনে নয়। যেমন: দু দিকে অপ যার= দ্বীপ, অন্তর্গত অপ যার= অন্তরীপ, নরাকারের পশু যে= নরপশু, জীবিত থেকেও যে মৃত= জীবন্মৃত, পণ্ডিত হয়েও যে মূর্খ= পণ্ডিতমূর্খ ইত্যাদি।

সমাস চেনার সহজ উপায়★ স্কুলে যখন
‘সমাস ‘ পড়ানো হত, তখন স্যারেরা একটু
দুষ্টুমী করেই বলতেন ‘সমাস ‘ শিখতে নাকি
ছয় মাস লাগে। যদিও কথাটি দুষ্টামীর
ছলে বলা কিন্তু কথাটি একটু বেশিই
সত্যিই। ৬ মাস তো দূরে থাক ৬ বছরেও
শিখা হলো না কোনটা কোন সমাস।
,
দ্বিগু সমাস কিভাবে চিনবেন জানেন?
আচ্ছা, দ্বিগু শব্দের “দ্বি ” মানে কী?
দ্বিতীয় শব্দে “দ্বি ” আছে না? আমরা ২
বুঝাতে “দ্বি ” শব্দটি ব্যবহার করি। ২ মানে
কী? একটি সংখ্যা। তাহলে যে শব্দে
সংখ্যা প্রকাশ পাবে এখন থেকে
সেটাকেই “দ্বিগু ” সমাস বলে ধরে
নিবেন। যেমন পরীক্ষায় আসলো শতাব্দী
কোন সমাস? আচ্ছা শতাব্দী মানে হল শত
অব্দের সমাহার। অর্থাৎ প্রথমেই আছে “শত
” মানে একশ, যা একটি সংখ্যা। সুতরাং এটি
দ্বিগু সমাস। একইভাবে ত্রিপদী ( তিন
পদের সমাহার)এটি ও দ্বিগু সমাস। কারণ
এখানে ও একটি সংখ্যা (৩) আছে। এবার
যেকোন ব্যাকরণ বই নিয়ে দ্বিগু সমাসের
যত উদাহরন আছে সব এই সুত্রের সাহায্যে
মিলিয়ে নিন।
,
এবার আসুন কর্মধারয় সমাসে। খুব বেশি
আসে পরীক্ষায় এখান থেকে। কর্মধারয়
সমাসে “যে /যিনি/যারা ” এই শব্দগুলো
থাকবেই। যেমন: চালাকচতুর – এটি কোন
সমাস? চালাকচতুর মানে ‘যে চালাক সে
চতুর ‘ তাহলে এখানে ‘যে ‘ কথাটি
আছে,অতএব এটি কর্মধারয় সমাস। তবে
কর্মধারয় সমাস ৪ প্রকার আছে। মুলত এই ৪
প্রকার থেকেই প্রশ্ন বেশি হয়। প্রথমেই
আসুম মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস চিনি।
নামটা খেয়াল করুন, মধ্যপদলোপী। মানে
মধ্যপদ অর্থাৎ মাঝখানের পদটা লোপ
পাবে মানে চলে যাবে। সহজ করে বললে
হয়, যেখানে মাঝখানের পদটা চলে যায়
সেটিই মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস।
যেমনঃ সিংহাসন – কোন সমাস? সিংহাসন
মানে ‘সিংহ চিহ্নিত যে আসন ‘। তাহলে
দেখুন এখানে ‘সিংহ চিহ্নিত যে আসন ‘
বাক্যটি থেকে মাঝখানের “চিহ্নিত ”
শব্দটি বাদ দিলে অর্থাৎ মধ্যপদ “চিহ্নিত ”
শব্দটি লোপ পেলে হয় “সিংহাসন “।
যেহেতু মধ্যপদলোপ পেয়েছে, অতএব এটি
মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস। উপমান
কর্মধারয় সমাস কিভাবে চিনবেন জানেন?
যদি ২টি শব্দ তুলনা করা যায় তবে সেটি
হবে উপমান কর্মধারয় সমাস। যেমনঃ
তুষারশুভ্র – কোন সমাসের উদাহরন? এটি
পরীক্ষায় অনেকবার এসেছে। শব্দটি
খেয়াল করুন “তুষারশুভ্র “। তুষার মানে বরফ,
আর শুভ্র মানে সাদা। বরফ তো দেখতে
সাদা। তাহলে তো এটি তুলনা করা যায়।
অতএব এটি উপমান কর্মধারয়। একইভাবে
“কাজলকালো “এটিও উপমান কর্মধারয়
সমাস।

Similar Posts